OPINIONS

পর্যটনেই হবে করোনা পরবর্তী সুনিশ্চিত বিনিয়োগ- ফজলে শাহীদ মনন

পৃথিবীতে যদি বিপদ, আপদ, রোগ, শোক না হতো তাহলে মহামূল্য স্বর্গের কোনো চাহিদাই থাকতো না। আমরণ তুষ্টির পেছনে ছুটে চলা থেকেই সম্ভাবনার জন্ম। ছোটবেলা থেকে জেনে আসা মানুষের মৌলিক চাহিদায় নব এবং ষষ্ঠতম সংযোজন হচ্ছে বিনোদন।

মহামারী করোনায় বিনোদন বলতে কেবলই অনলাইন সেবা চালু আছে। মানুষ বন্দি ঘরে আর পর্যটন স্পট গুলো বন্দি প্রকৃতির কাছে। এই ফাকে প্রকৃতি সেজে উঠেছে তার আপন মহিমায়। তার সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে দেশের উত্তর এবং দক্ষিণাঞ্চলের নতুন নতুন পর্যটন স্পট আবিষ্কার। ক্ষুদ্র আয়তনের এসব স্পট গুলো নিয়ে স্থানীয় এবং জাতীয় সংবাদ মাধ্যমে প্রচারণা চলছে। এখন কেবল প্রয়োজন সুসংগঠিত পৃষ্ঠপোষকতার।  

দেশের সর্বাধিক পরিচিত স্পট গুলোও এই দীর্ঘ বিরতিতে গুছিয়ে নিচ্ছে নিজের আসল সৌন্দর্য। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের পাড় ঘেষে তৈরি হয়েছে সবুজের কার্পেট আর সমুদ্রে যেনো হরহামেশাই দেখা মিলছে ডলফিন, কচ্ছ্বপ আর লাল কাকড়ার। এর ফলে নতুন করে আশা জাগিয়েছে স্কুবা ডাইভিং সেবার।

পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি আর বান্দরবান; করোনায় লকডাউনের দরূন হয়ে উঠেছে আরো রহস্যময় এবং অভিযাত্রীসুলভ। কিছুদিন পূর্বেই বান্দরবানের কেউক্রাডং চূড়া ভ্রমণের নতুন এবং গাড়ি নিয়ে উঠার পথ আবিষ্কৃত হলেও, করোনায় পর্যটক শূণ্যের কোটায় থাকায় সেই উদ্যোগ তেমন সফল হতে পারেনি। দেশের সব জেলার মধ্যে একমাত্র করোনা মুক্ত জেলা হচ্ছে রাঙ্গামাটি। ঝুলন্ত ব্রিজ, কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝর্ণা, সাজেক ভ্যালি ছাড়াও নতুন সংযোজন বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র, পেদা টিং টিং রেস্তোরা, উপজাতীয় জাদুঘর। এগুলো একদিকে যেমন প্রকৃতি প্রেমীদের আকর্ষিত করেছে তেমনই দেশের এবং দেশের বাইরের গবেষক ও ঐতিহাসিক জ্ঞানপিপাসুদের নতুন চারণ ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। পার্বত্য জেলা গুলোর নতুন আকর্ষণ দেশী বিদেশী সুস্বাদু ফল যেমন আনারস, কমলালেবু, মাল্টা, রকমেলন, ড্রাগন ইত্যাদি। এতদ ফলগুলোয় এখন পার্বত্য জেলার বাজার ছেয়ে গেছে, কিন্তু নেই কোনো পর্যটক, নেই কোনো ক্রেতা। দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারে যথেষ্ট চাহিদা থাকা সত্ত্বেও করোনার দরুণ পরিবহন সঙ্কটে পড়েছে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। সামান্য সুদৃষ্টিই তাদের জন্যে এনে দিতে পারে প্রাপ্তির আনন্দ।

চট্টগ্রামের হালদা নদী রুই জাতীয় মাছের প্রাকৃতিক মৎস্য আহরণ ক্ষেত্র। এটি দেশের এবং পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ এজাতীয় মৎস্য প্রজনন স্থল। মৎস্য অধিদপ্তরের সুত্র মতে, এই বছর হালদা নদীতে রেকর্ড সংখ্যক ডিম পাওয়া গেছে। দেশের নানা জায়গা থেকে হালদা নদীর এই  ডিম ও পোণা সংগ্রহ করে চাষীরা। করোনার দরূণ বিপুল সম্ভাবনার এই সম্পদ এবার সুষ্ঠু বণ্টন এবং উৎপাদনের পীড়ায় পড়েছে।

ঘূর্ণিঝড় আম্পান যতোটা ক্ষতি করেছে সুন্দরবনের, করোনা মহামারী ঠিক ততোটাই সুযোগ করে দিয়েছে গাছপালা, পশুপাখি ও স্বরীসৃপকে। বনের ভেতরে পূর্বের সাতটির সাথে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে আরো চারটি পর্যটন স্পট। পর্যটকদের বিনোদনের জন্যে এখানে আছে জেটি, ওয়াচ টাওয়ার, উডেন ট্রেক, কুমির এবং হরিণ প্রজনন কেন্দ্র। নতুন করে আরো ১৩টি স্থান বাঘের অভয়ারন্য হিসেবে ঘোষণা করায় বাঘের সংখ্যাও বিগত ২/৩ বছর ধরে বাড়ছে। বন বিভাগের হিসাবে, এবার রেকর্ড পরিমাণ মধু সংগ্রহ করা হয়েছে সুন্দরবন থেকে। কুয়াকাটার অদূরে আরো দুটি লাল কাকড়ার দ্বীপ নজর কেরেছে সবার।

দেশে এখন অনেকগুলো মেগা প্রকল্প একসাথে চলমান, এর কারণে প্রতিদিনই বহু বিদেশী লোক এদেশে আসছেন এবং পাচ তারকা সহ অন্যান্য মান সম্মত হোটেলে থাকছেন। করোনার দরুণ আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ থাকায় হোটেল গুলো পড়েছে বিপাকে। তবুও থেমে নেই কর্মযজ্ঞ। এছাড়া নব নির্মিত বিশ্বমানের আরো সাতটি পাচ তারকা হোটেল নির্মিত হচ্ছে ঢাকা, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও সিলেটে। মহামারি পরবর্তী এই হোটেল গুলো হবে লাখো মানুষের কর্ম সংস্থানের উৎস।

করোনার কারণে আন্তর্জাতিক পর্যটনে বেশ পরিবর্তন আসবে। বিমান ভাড়া বাড়ার পাশাপাশি অনেক বিধি নিষেধ আরোপ হবে ভ্রমণের ক্ষেত্রে। ফলে মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণির যেসব পর্যটক থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভারত, নেপাল বা সমমানের দেশে যেতেন, বিমান ভাড়া এবং অন্যান্য খরচ বাড়ার কারণে তারা করোনা পরবর্তী সেসব দেশ ভ্রমণে সতর্ক হবেন।  টানা অনেকদিন বাসায় থাকার দরুণ মানুষের মধ্যে একইসাথে যে বিরক্তি এবং সচেতনতা তৈরি হয়েছে, তারা বিদেশের যাওয়ার ঝামেলা না নিয়ে নিজ দেশেই ঘুরতে বেরোবেন। এতে দেশের পর্যটন খাতে সৃষ্টি হবে সফল বিনিয়োগের সম্ভাবনা।

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ভ্রমণের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল হলেও বিমান সংস্থা গুলোকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত খরচ গুণতে হচ্ছে, কারণ পূর্বের মতোন সকল যাত্রীকে পাশাপাশি বসতে দেয়া যাচ্ছেনা। একটি বিমান যেখানে ১০০ জন যাত্রী পরিবহনে সক্ষম, সেখানে এখন ৫০ জনের মতোন উঠছেন, এর সাথে যোগ হয়েছে করোনা পরীক্ষার ফল দেখানোর বাধ্যবাধকতা। বুকিং সাইট ট্রাভেলোসিটির তথ্য মতে, এই সময়ে তারা যতগুলো ভ্রমণের বুকিং পেয়েছে তার বেশিরভাগই ভ্রমণকারীর বাড়ির একশো মাইলের ভেতরে। ঢাকা থেকে খাগড়াছড়ি ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা থাকবে না, কিন্তু ঢাকা থেকে সিকিম কিংবা ব্যাংকক যেতে অনুসরণ করতে হবে নানা গাইডলাইন। আর ওই এলাকা যদি করোনা হটস্পট হয়ে থাকে, তাহলে তো কথাই নেই। এতে বোঝাই যাচ্ছে, বিনিয়োগের জন্যে করোনা পরবর্তী দেশীয় বাজারটি হবে বিশাল পরিমাণের।

করোনা মহামারীর জন্যে বিশ্ব মূলত চীন কে দায়ী করে আসছে শুরু থেকেই। তার সাথে নতুন মাত্রা যোগ করেছে হংকং ইস্যু। এর ফলে করোনা পরবর্তী সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ চীন থেকে অন্যত্র স্থানান্তর করা হচ্ছে, এবং সেটি বাংলাদেশের জন্যে বিশ্ব অর্থনীতির পক্ষ থেকে একটি সুসংবাদ। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানি এবং অন্যান্য দেশের কোম্পানি গুলো এরই মধ্যে সুবিধাজনক স্থান হিসেবে বাংলাদেশকে বিবেচনা করছে। কোম্পানি স্থানান্তরের দরুণ এসকল দেশ থেকে পর্যটক আসার সম্ভাবনাও বেড়ে গেছে। ফলে দাড় খুলেছে সফল বিনিয়োগের।

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা পাকিস্তানের পর্যটন রাজনৈতিক অস্থিরতা, চীনের সাথে যুদ্ধাবস্থা, করোনা মহামারী ইত্যাদি নানা কারণে এখন বিপর্যুস্ত। কিন্তু বাংলাদেশের অবস্থা সেখানে অনেকটাই শান্ত। এর দরুণ খোদ তাদের দেশ থেকেই বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিমাণ গত বছরের চেয়ে বেশি আসছে বলে জানিয়েছে ইনভেস্টমেন্ট কমিশন অব বাংলাদেশ।

কোভিড ১৯ পরবর্তী সময়ে পর্যটন খাতকে পুনরায় উজ্জীবিত করতে বেশকিছু কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের চিন্তা করছে সরকার। যেসকল পণ্য পর্যটনের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট, তাদের উপর থেকে শুল্ক ও কর মওকুফ করে পর্যটন পুনরুদ্ধারে সরকার দৃঢ় প্রত্যয়ী। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য মতে, বর্তমানে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। করোনায় দীর্ঘ বন্দি জীবন পরবর্তী এই সংখ্যা আরো বাড়বে নিঃসন্দেহে। তখন তাদের এই বাড়তি চাপ সামাল দিতে না পারলে পর্যটন থেকে কাঙ্ক্ষিত মুনাফা অর্জন সম্ভব হবেনা। দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যটকদের পরবর্তী গমনস্থল হতে চলেছে বাংলাদেশ।

পর্যটন এমন একটি শিল্প যেটি এর পাশাপাশি ৫৯ টি খাতকে সরাসরি প্রভাবিত করে, যেমন যোগাযোগ, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ইত্যাদি। প্রতিদিনই এই শিল্প বেড়ে চলেছে। অন্য যেকোনো শিল্পের যেখানে উত্থান পতন আছে, পর্যট্নে সেখানে ঝুকি কম, সম্ভাবনা বেশি। আর করোনা পরবর্তী সময়ে সেই সম্ভাবনা আরো বাড়বে, কারণ পর্যটকদের তখন বিভিন্ন সেফটি গিয়ারস এবং অব্যবহ্রত ফ্রেশ পণ্যের প্রয়োজোনিয়তা দেখা দেবে। পর্যটন এখন এমন একটি শিল্প হয়ে দাড়িয়েছে যেটিকে সামান্য প্রণোদনা দিলেই দেশের অন্য যেকোনো প্রধাণ শিল্পকে টক্কর দিতে সক্ষম। বিনিয়োগ বান্ধব পর্যটন শিল্প দেশের বিপুল যুবসমাজের কর্মসংস্থানের চাহিদা একাই অনেকটা সামাল দিতে পারে, প্রয়োজন কেবল সরকারের স্বদ্দিচ্ছা আর ব্যবসায়ীদের সুনজর। করোনা পরবর্তী বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পর্যটন হতে পারে ঘুরে দাড়ানোর মূলমন্ত্র।


ফজলে শাহীদ মনন, শিক্ষার্থী, ট্যুরিজম এন্ড হসিপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট,

ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ,

হাজী মুহম্মদ মুহসিন হল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

ফোন নাম্বারঃ ০১৭২০৬৫৬৯৯৫

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close