WOMEN'S WINDOWবাংলা

নারীরা পুরুষের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে? এর কারণ কী?

গড়পড়তা পুরো পৃথিবীতেই নারীরা পুরুষদের চেয়ে দীর্ঘ জীবনকাল উপভোগ করে। ডেভিড রবসন নামে একজন লোক অনেক খেটেখুটে এর পেছনের কারণগুলো অনুসন্ধান করেছেন। তার ভাষায়- যে মুহূর্তে আমার জন্ম হয়েছিল,সে মুহূর্ত থেকে আমার সাথে জন্ম নেয়া অর্ধেক শিশুর আগেই আমার মারা যাওয়ার নিয়তি তৈরি হয়ে গিয়েছিল। এটা এমন এক অভিশাপ যা আমার এড়িয়ে যাবার কোনো অবকাশ নেই। এর কারণ? আমার লিঙ্গ। আমি পুরুষ হবার কারণে একই দিনে জন্ম নেয়া নারীদের তুলনায় প্রায় তিন বছর আগে আমার মৃত্যু হবে- পরিসংখ্যান এমনটাই বলছে। 

কেন একজন ছেলে হবার কারণে আমি আমার সমবয়সী নারীদের তুলনায় আগে মারা যাব? এবং আমার কি এই লিঙ্গের অভিশাপ থেকে বেড়িয়ে আসা সম্ভব? এই গোলমেলে বৈষম্যটি কয়েক দশক ধরে পরিচিত একটি বিষয়। সাম্প্রতিক বিজ্ঞান এর কিছু উত্তরে এসে পৌঁছেছে। একটি প্রাথমিক ধারণা হলো,পুরুষেরা নিজেরাই এর পেছনে দায়ী।

যুদ্ধে অংশ নিয়ে, খনিতে কাজ করে কিংবা জমিতে চাষ করে তারা তাদের প্রাণের উপর অতিরিক্ত ঝুঁকি নেয় এবং ভবিষ্যতে বড় ধরনের ক্ষতির শিকার হয়। তবে, এটাই যদি মূল কারণ হয়ে থাকে তবে নারী পুরুষ উভয়কে মিলিতভাবে একই রকম পরিশ্রমসাধ্য কাজ করতে দিয়ে আমরা এ বৈষম্য দূর করতে পারি।

সত্যিকার অর্থে বিশাল সামাজিক পরিবর্তন সাধিত হলেও নারী-পুরুষের বেঁচে থাকার এই বৈষম্য ঠিকয় বজায় থাকে। সুইডেনের কথাই ধরা যাক, এই দেশটি সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য ঐতিহাসিক দলিল পেশ করে থাকে। ১৮০০ সালে নারীদের প্রত্যাশিত গড় আয়ু ছিল ৩৩ বছর এবং পুরুষদের ৩১ বছর। বর্তমানে এটি যথাক্রমে ৮৩.৫ বছর এবং ৭৯.৫ বছর। এই দুই ক্রান্তিকালেই নারীরা দৃশ্যত পুরুষদের তুলনায় ৫ শতাংশ সময় বেশি বাঁচে।

একটি সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের মতে- “পুরুষদের তুলনায় এই অসামাঞ্জস্যপূর্ণ বেঁচে থাকার সুবিধা নারীদের প্রাথমিক,বার্ধক্য এবং সম্পূর্ণ জীবনে; প্রতিটি দেশে,প্রতিটি বছর দেখা যায়। নারী পুরুষের মাঝে এটিই মনে হয় সবচেয়ে ক্লাসিক বৈষম্য।

এটাও দাবী করা যায় না যে, পুরুষেরা তাদের শরীর তথা জীবনের প্রতি তুলনামূলকভাবে কম যত্নশীল। ধূমপান,মদ্যপান এবং অতিরিক্ত খাদ্যগ্রহণের মতো বিষয়গুলো হয়তো ব্যাপারটাকে আংশিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে, কিন্তু এটাই চূড়ান্ত কারণ নয়। রাশিয়াতে নারীদের তুলনায় পুরুষেরা ১৯ বছর আগে মারা যায়,আংশিকভাবে যার কারণ অতিরিক্ত ধূমপান এবং মদ্যপান। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে নারী শিম্পাঞ্জি, নারী গরিলা এবং নারী ওরাংওটাংরাও তাদের প্রজাতির পুরুষদের তুলনায় বেশি দিন বাঁচে। আপনি কি কখনো কোনো শিম্পাঞ্জি,গরিলা কিংবা ওরাংওটাংকে সিগারেট বা মদের গ্লাস হাতে দেখেছেন? না।

এটা বোঝা যাচ্ছে যে নারী-পুরুষের আয়ু সংক্রান্ত উত্তরটা আমাদের বিবর্তনের মধ্যেই লুকিয়ে আছে। “অবশ্যই সামাজিক এবং জীবনভিত্তিক বিষয়গুলো আয়ুর উপর প্রভাব ফেলে,কিন্তু তার চেয়েও গভীর কিছু রয়েছে আমাদের পরস্পরের জীববিজ্ঞানের মধ্যে।” এমনটাই বলেন ইউরোপের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানের গবেষক টম কার্কউড।

জীববিজ্ঞানের অনেক বিষয় এর পেছনে কাজ করে। গুচ্ছ-ডিএনএ দিয়ে শুরু হোক। এরা প্রতিটি কোষের মধ্যে যা ক্রোমোসোম হিসেবে পরিচিত। ক্রোমোসোম জোড়ায় জোড়ায় থাকে,এবং নারীদের দুটি X ক্রোমোসোম, পুরুষদের একটি X ও একটি Y। ক্রোমোসোম সংক্রান্ত এই পার্থক্যটি খুব চতুরভাবে কোষের বয়স পরিবর্তন করে দিতে পারে। যেহেতু নারীদের প্রতি কোষে দুটি X ক্রোমোসোম রয়েছে, তাই তাদের প্রতিটি জিনের অনুলিপি থাকে,অর্থাৎ তাদের অতিরিক্ত একটি থেকে যায়,যদি অপরটি কাজ না করে অথবা নষ্ট হয় তখন কাজে লাগে। পুরুষদের বেলায় এমন বিকল্প কিছু নেই।

নারীদের মতো কোনো বিকল্প না থাকার কারণে ফলাফল স্বরূপ অনেক কোষই সময়ের সাথে সাথে অকার্যকর হয়ে যাবার সম্ভাবনায় থাকে। এতে পুরুষদের রোগের ঝুঁকি বাড়তে থাকে। অন্যান্য বিকল্প বিষয়গুলোর মধ্যে ‘ব্যায়ামকারী নারীর হৃদপিণ্ড’ (jogging female heart) হাইপোথিসিস। এর ধারণাটি হলো, একজন নারীর হৃদপিণ্ডের গতি বাড়তে থাকে রজচক্রের দ্বিতীয় অর্ধাংশে,যা পরিমিত ব্যায়ামের মতই উপযোগী। এবং এই প্রক্রিয়াটি হৃদপিণ্ডজনিত যেকোনো রোগ হবার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।

অথবা হতে পারে আকৃতিগত কোনো সহজ ব্যাপার। লম্বা মানুষদের শরীরে কোষের সংখ্যা বেশি,এই ধরনের কোষগুলো ক্ষতিকরভাবে বিকশিত হবার সম্ভাবনা বেশি। তুলনামূলকভাবে বড় শারীরিক গঠন অধিক পরিমাণ শক্তি দহন করে। যেহেতু পুরুষেরা মেয়েদের চেয়ে প্রায়ই লম্বা হয়ে থাকে, সেহেতু তাদের আরো দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

তবে প্রকৃত কারণ সম্ভবত টেস্টোস্টেরনের মাঝে নিহিত আছে, যা অধিকাংশ পুরুষদের পুরুষালী বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী। গভীর কণ্ঠস্বর, লোমশ বুক হতে শুরু করে নিরাভরণ টাক মাথা পর্যন্ত বৈশিষ্ট্যগুলোর জন্য টেস্টোস্টেরন দায়ী।

কোরিয়ার Imperial Court of the Chosun Dynasty থেকে অপ্রত্যাশিত কিছু তথ্য পাওয়া যায়। কোরিয়ান বিজ্ঞানী হান নাম পার্ক উনিশ শতাব্দী থেকে কোর্ট লাইফ রেকর্ডগুলো বিশ্লেষন করেন,তার মধ্যে ৮১ জন নপুংসকও ছিল। যাদের বয়ঃসন্ধির আগেই শুক্রাশয় অপসারণ করে ফেলা হয়। তার বিশ্লেষণ থেকে দেখা যায়, ঐ নপুংসকেরা ৭০ বছরের মতো আয়ু পেতো, যেখানে অন্যান্য স্বাভাবিক পুরুষেরা আয়ু পেতো গড়ে ৫০ বছর। তাদের ১০০ তম জন্মদিন পালনের সম্ভাবনা ছিল প্রকট। এমনকি ঐ সময়ের রাজারাও এমন আয়ুর কাছাকাছি আসতে পারতো না।

যদিও শুক্রাশয় নিয়ে অন্য সব গবেষণা আয়ু নিয়ে এমন পার্থক্য দেখায় না। সামগ্রিকভাবে দেখা যায়, শুক্রাশয় ছাড়া পুরুষ মানুষ ও অন্যান্য পুরুষ প্রাণীরা বেশিদিন বেঁচে থাকে।

আয়ুর পার্থক্যের সঠিক কারণগুলো এখনো অধরা। তবে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ডেভিড জেমস মনে করেন করেন, এই ক্ষতি হয়তো বয়ঃসন্ধিকাল শেষ হয়ে যাবার কারণেই হয়। তার দাবী প্রমাণের জন্য তিনি মানসিক রোগীদের কিছু বিষন্ন কেস উপস্থাপন করেন। চিকিৎসার অংশ হিসেবে এই রোগীদেরকে নপুংসকে পরিণত করতে হয়। কোরিয়ান নপুংসকদের মতো তারাও অন্যান্যদের চেয়ে অনেকদিন বেশি বেঁচে ছিল। উল্লেখ্য তাদের ১৫ বছরের আগেই খোঁজাকৃত করা হয়। টেস্টোস্টেরন হয়তো পুরুষের শরীরকে সাময়িকভাবে শক্তিশালী করে, কিন্তু একই পরিবর্তন তাদের হৃদপিণ্ডজনিত রোগ সহ অন্যান্য সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় এবং পরবর্তী জীবনে ক্যান্সারের দিকে ঠেলে দেয়।

উদাহারণসরূপ বলা যায়, টেস্টোস্টেরন হয়তো আমাদের দেহে সেমিনাল ফ্লুইডের উৎপাদন বৃদ্ধি করে, কিন্তু পরবর্তীতে প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে, কিংবা হৃদপিণ্ডের সংবহনন্তান্ত্রিক ক্রিয়া পরিবর্তন করে দিতে পারে যা প্রথম দিকে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি করলেও পরবর্তীতে উচ্চ-রক্তচাপ, অথেরোস্ক্লেরোসিসের জন্ম দিতে পারে। এমনটাই বলেন জনাব জেমস।

নারীরা শুধুমাত্র টেস্টোস্টেরনের ঝুঁকি থেকেই মুক্ত নয়, পাশাপাশি তারা আরো সুবিধাও পায়। তারা নিজেদের “যৌবনের স্পর্শমণি” (elixir of youth) থেকেও সুবিধা পায়, যা তাদের ভবিষ্যতের ভয়াবহতাগুলো থেকে সহজে উৎরে যেতে সাহায্য করে। নারীর সেক্স হরমোন ইস্ট্রোজেন একটি “অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট”,যা কোষে চাপ সৃষ্টিকারী বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থদের বিতাড়িত করে। প্রাণীদের ক্ষেত্রেও এটা কার্যকর। প্রাণীদের নিয়ে পরীক্ষায় দেখা গেছে নারীদের দেহে ইস্ট্রোজেনের ঘাটতি হলে কিংবা যারা ইস্ট্রোজেন স্বল্পতা নিয়ে বেড়ে ওঠে তারা বেশিদিন বাঁচে না। ঠিক বিপরীতটি ঘটে পুরুষ নপুংসকদের ক্ষেত্রে।

নপুংসকতাকে দূরে ঠেলে বংশগতির ধারা অব্যাহত রাখার জন্যই এমনটি ঘটে থাকে। এ হিসেবে পুরুষের সামান্য স্বল্প আয়ু মানুষ তথা পুরো প্রাণিজগতকে বিবর্তনীয় উপযোগীতা প্রদান করে। কিছু পার্থক্য নারী-পুরুষ উভয়কেই টিকে থাকতে সাহায্য করে। মিলনের ক্ষেত্রে নারীরা প্রধানত অধিক পরিমাণ পুরুষালী বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন তথা অধিক পরিমাণ টেস্টোস্টেরন নিঃসরণকারী পুরুষের প্রতি আকৃষ্ট হয়। এতে করে আয়ু বৈষম্যের ধারাও অধিক হতে থাকে। চাইলেও সহজ কিছু প্রচেষ্টা কিংবা উদ্যোগ দিয়ে এটা দূর করা সম্ভব নয়।

যদিও ব্যাপারটি পুরুষের ভালো লাগার কথা নয়। তবে বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী এর একটি সুনির্দিষ্ট উত্তরের জন্য আরো অনেক কাজ করে যেতে হবে। কার্কউডের মতে- হরমোন সহ অন্যান্য নিয়ামক জীবনযাপনের ক্ষেত্রে অনেক পরিবর্তন আনতে পারে তা আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। হতে পারে, এই অর্জিত জ্ঞানই আমাদের দীর্ঘ দিন বাঁচিয়ে রাখতে সহায়তা করবে।


তথ্যসূত্রঃ A feature Published on  BBC By David Robson ( এখানে ক্লিক করুন )

অনুবাদ এবং সংকলনেঃ সাজ্জাদ জামান সেতু, ই-মেইলঃ [email protected]


আরো পড়ুনঃ 

১। করোনা ভাইরাসঃ গণপরিবহনে সতর্কতা 

২। করোনা ভাইরাসে মানসিক দুশ্চিন্তাঃ আমাদের করণীয়

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close